দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের ঘোষণা ট্রাম্পের

যুক্তরাষ্ট্রে জাপানি পণ্য প্রবেশে উচ্চ শুল্কের বাধা থাকছে না

ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত শুল্কনীতি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত শুল্কনীতি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির সঙ্গে নতুন করে বাণিজ্য চুক্তি সই হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এ চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে জাপানি পণ্য প্রবেশে পূর্বঘোষিত বড় অংকের শুল্ক পরিশোধ করতে হবে না। জাপান থেকে গাড়ি আমদানির ওপর আরোপিত শুল্কহার কমানো হচ্ছে। এজন্য যুক্তরাষ্ট্রে বড় অংকের বিনিয়োগ ও ঋণের প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে জাপানকে। খবর রয়টার্স ও এপি।

জাপান-মার্কিন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তির বিস্তারিত তথ্য এখনো স্পষ্টভাবে প্রকাশ হয়নি। জাপানের অটোমোবাইল খাতের এক-চতুর্থাংশের বেশি পণ্যের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। খাতটি আগে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক দিত, চুক্তির আওতায় তা এখন ১৫ শতাংশে কমে আসবে। এছাড়া ১ আগস্ট থেকে অন্যান্য পণ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও তা কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

চুক্তি সইয়ের ঘোষণার পর জাপানের নিক্কেই স্টক সূচক প্রায় ৪ শতাংশ বেড়ে এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। বিশেষ করে টয়োটা ও হোন্ডার শেয়ার যথাক্রমে ১৪ ও ১১ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘আমি জাপানের সঙ্গে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যচুক্তিতে সই করেছি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ সময় এবং জাপানের সঙ্গে সবসময় আমাদের সুসম্পর্ক থাকবে।’

গত রোববার অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত হয় জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার দল। এরপর তার পদত্যাগের খবর ছড়ায়। ওই খবরকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ উল্লেখ করে নতুন চুক্তিকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য উদ্বৃত্তধারী দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন শুল্কহার’ বলে আখ্যা দেন তিনি। ইশিবার মতে, এ চুক্তি পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করবে।

মার্কিন পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, পণ্য বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম বৃহত্তম অংশীদার জাপান। গত বছর তাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের আকার ছিল প্রায় ২৩০ বিলিয়ন বা ২৩ হাজার কোটি ডলার। এ সময় জাপানের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ৭ হাজার কোটি ডলার। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় বিদেশী বিনিয়োগকারী জাপান, গত বছর এর আকার ছিল ৮১৯ বিলিয়ন ডলার।

চুক্তির আওতায় জাপান সরকার-সমর্থিত সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ঋণ ও গ্যারান্টির ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ৫৫০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিনিয়োগ প্যাকেজ থাকবে। এটি জাপানি কোম্পানিগুলোকে ওষুধ ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে টেকসই সরবরাহ চেইন গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।

ট্রাম্পের সঙ্গে হোয়াইট হাউজে বৈঠকের পর জাপানের প্রধান বাণিজ্য আলোচক রিয়োসেই আকাজাওয়া এক্সে লেখেন, ‘মিশন কম্পলিট।’ তিনি জানান, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের মতো ৫০ শতাংশ রফতানি শুল্ক বসানো হয়েছে জাপানের এমন পণ্যের ওপর এ চুক্তি প্রযোজ্য নয়। মার্কিন গাড়ি ও ট্রাক আমদানিতে জাপান যে অতিরিক্ত নিরাপত্তা পরীক্ষা চালায় তাও তুলে নেয়া হবে।

ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘‌এ চুক্তির আওতায় জাপানে আরো বেশি মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানি করবে।’ তবে শিগেরু ইশিবা বলেন, ‘‌বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই মার্কিন চালের আমদানির অংশ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এতে জাপানের কৃষি খাতের স্বার্থ ত্যাগ করা হয়নি।’

চুক্তি চূড়ান্ত করার পেছনে বিনিয়োগ প্যাকেজ নিয়ে শেষ মুহূর্তের আলোচনার বড় ভূমিকা ছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সহকারী ড্যান স্কাভিনোর এক্সে পোস্টে শেয়ার করা ছবিতে দেখা গেছে, রিয়োসেই আকাজাওয়ার সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্পের সামনে থাকা একটি নথির শিরোনাম ছিল ‘জাপান ইনভেস্ট আমেরিকা’। সেখানে বড় করে লেখা ‘৪০০ বিলিয়ন ডলার’ কেটে হাতে ‘৫০০’ লিখে দেয়া হয়েছে।

এছাড়া হোয়াইট হাউজে দেয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প আশাবাদ ব্যক্ত করেন, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র আলাস্কায় একটি গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণে যৌথ উদ্যোগে কাজ করবে, যা তার প্রশাসনের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য।

বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করেছিলেন, শুল্ক বৃদ্ধির ফলে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপান মন্দায় পড়তে পারে।

তবে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এ বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা আসার পর ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে না পারায় দেশগুলোর মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা। ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারেও। চুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়লে দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের গাড়ি নির্মাতাদের শেয়ারদরে উল্লম্ফন দেখা যায়। জাপানের সঙ্গে চুক্তির ধরন থেকে আশা করা হচ্ছে, ইউরোপও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অনুরূপ চুক্তি করতে পারবে। তবে মার্কিন গাড়ি নির্মাতারা এ চুক্তি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। কারণ কানাডা ও মেক্সিকোর কারখানাগুলো থেকে আমদানি করা গাড়ির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক বহাল থাকছে।

গতকাল ইউরোপের স্টক্স ৬০০ সূচক ১ শতাংশ বেড়েছে। গাড়ি শিল্পের শেয়ারদর বাড়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। যুক্তরাজ্যের এফটিএসই সূচক দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ওয়াল স্ট্রিটে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার দশমিক ২ ও নাসডাক ফিউচার বেড়েছে দশমিক ১ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ার গাড়ি নির্মাতাদের শেয়ারদরও বেড়েছে।

আগামী ১ আগস্টের সময়সীমার আগে একাধিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করতে ট্রাম্প প্রশাসন মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। ওই সময়সীমা পেরিয়ে গেলে পূর্বঘোষিত নতুন উচ্চ শুল্ক কার্যকর হবে। এরই মধ্যে যুক্তরাজ্য, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে চুক্তির কাঠামো ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প এবং চীনের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি শুল্ক বিবাদ সাময়িক স্থগিত রয়েছে। তবে বেশির ভাগ দেশের সঙ্গে বিস্তারিত চুক্তি এখনো বাকি। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধিরা গতকাল ওয়াশিংটনে পৌঁছেছেন।

আরও